Sunday, April 21, 2013

‘নারী নীতি’ নিয়ে বিভ্রান্তি


‘নারী নীতি’ নিয়ে বিভ্রান্তি

ফরিদা আখতার
Friday 19 April 13





এক

হেফাজতে ইসলাম এপ্রিলের ৬ তারিখে ঢাকা শহরে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় একটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করে প্রশাসনের সঙ্গে ওয়াদা অনুযায়ী ঠিক ঠিক পাঁচটার সময় শেষ করে ফিরে গেছেন। ঢাকা শহরের মানুষ শাপলা চত্বরে এতো আলেম ওলামাদের একসাথে কখনো দেখে নি, তারা বিস্মিত। কত মানুষ জড়ো হয়েছিলেন তা নিয়ে সঠিকভাবে কোন পরিসংখ্যান না পাওয়া গেলেও সংখ্যাটা তাক লাগিয়ে দেয়ার মতোই ছিল। হেফাজতের এই লং মার্চ যেন না হতে পারে তার জন্য সরকার নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল; ঢাকাগামী সকল প্রকার যানবাহন বন্ধ করার পরও এতো মানুষ কি করে ঢাকায় এলো তা বিস্ময়ের ব্যাপার বটে।

হেফাজতের এই কর্মসুচী শেষ হয়েছে, তাঁরা নিজ নিজ এলাকায় ফিরেও গেছেন, কিন্তু শেষ হয় নি তাঁদের নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনা। তবে টেলিভিশনের টকশোগুলোর ধরণ পালটে গেছে। প্রায় প্রতিটি চ্যানেলে একজন হেফাজতের মুফতি আসছেন তাঁদের ১৩ দফা দাবীর ব্যাখ্যা দিতে, কিংবা একই মুফতিকে এক চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলে দৌড়াতে হচ্ছে অতিথি হয়ে।

হেফাজতের তেরো দফা বোঝা এবং বোঝানোর দরকার আছে। সেই দিক থেকে হেফাজতে ইসলামের পক্ষে গণমাধ্যমে মুফতিদের এই উপস্থিতি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। চ্যানেলগুলোর পক্ষ থেকে তাঁদের ডাকা হচ্ছে শুধু ১৩ দফা বোঝার বা বোঝানোর জন্য ভাবলে ভুল হবে। বরং অধিকাংশ সময় ডাকা হচ্ছে তাঁদের একটু হেনস্থা বা বেকায়দায় ফেলার জন্যে। তাঁরা যে চিন্তাচেতনায় সমাজের পশ্চাতপদ মানুষ এটা যে কোন ভাবে প্রমাণ করা অনেক গণমাধ্যমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন আলেমকে ঘায়েল করার জন্য থাকছেন তিন চারজন বুদ্ধিজীবী, নারী নেত্রী এবং রাজনীতিবিদ। দর্শকরা উপভোগ করছেন এই আলোচনা। টক শো যেন একটি খেলা। শো-এর পর দর্শকরা কে জিতলো, কে হারলো, এই তর্কে মাতে। নিজ নিজ অবস্থান অনুযায়ী খুশী বা অখুশী হয় অনেকে।

তের দফা দাবী না মানলে কঠোর কর্মসুচীর ঘোষণা দিয়েছেন হেফাজতে ইসলাম। তের দফার দুটো দফাতেই নারীদের কথা আছে। হেফাজত নারীদের মধ্যযুগে ঠেলে দিচ্ছে বলে হায় হায় শুরু হয়ে গেছে অনেকের মধ্যে, বিশেষ করে যাঁরা নিজেদের ‘প্রগতিশীল’ মনে করেন, তাঁরা দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন।

এর মধ্যে সাধারণ মানুষ একটু বিভ্রান্ত হচ্ছেন। এই ঘটনা এ্মন এক সময় ঘটলো যখন একদিকে বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার আন্দোলন চলছে, তাদের নেতা কর্মীরা জেলে; অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন গরম হয়ে আছে। একই সময় শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ নতুন মাত্রা যোগ করে দেশকে একেবারে তরমুজের মতো করে দুইভাগ করে ফেলেছে। কতিপয় ব্লগারের মহানবী (সঃ)কে নিয়ে ভয়াবহ কটুক্তি করেছে। তাদের এই নাস্তিকতার বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলাম সক্রিয় হয়ে ওঠে। যে কেউ নাস্তিক হতে পারে কিন্তু অন্যের বিশ্বাস, ধর্ম বা তাদের ধর্মের প্রিয় মানুষদের বিরুদ্ধে কুৎসিত ও কদর্য ভাবে লেখালেখি করতে পারে না।

আমি যতদুর জানি, হেফাজতে ইসলাম জামায়াতে ইসলামীর বিপক্ষে। তারা যুদ্ধাপরাধের বিচার চাইছে, কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চকেও তারা গ্রহণ করতে পারছেন না। হেফাজতে ইসলাম ‘নাস্তিক’ ব্লগারদের, বিশেষ করে যারা ধর্মের ও রাসুলেরও অবমাননা করেছে, তাদের শাস্তির দাবী নিয়ে এসেছে। শাহবাগ শুরু হয়েছিল যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবি নিয়ে। কিন্তু এই একটি দাবীর পর এখন জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করা,এরপর দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ করা,শেষে মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার করা সহ শাহবাগের ছয় দফা নানাদিকে বিস্তারিত হয়েছে। হেফাজতে ইসলামও ব্লগারদের শাস্তির দাবী থেকে এখন নিয়ে এসেছে ১৩ দফা। তের দফার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে মাহমুদুর রহমানের মুক্তি দাবী।

দুই

শাহবাগের ৬ দফা নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয় না, কারণ ধরে নেয়া হয়েছে এই সব দাবী নিয়ে কোন বিতর্ক নাই। সরকারের মেনে নেয়ার ব্যাপার মাত্র। যা সরকার একের পর এক তাদের জন্য করে যাচ্ছে। যদিও ছয় দফা নিয়েও বিতর্ক হতে পারে। আমি হেফাজতের ১৩ দফা নিয়েই লিখছি, কিন্তু সব দফা নিয়ে নয়। শুধু নারী অধিকারের প্রশ্নের সাথে জড়িত দুটি দাবীর (দাবী নং ৪ ও ৫) বিষয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি।

হেফাজতে ইসলামের দাবীগুলোর ঢালাও বিরোধিতা করার কারণ আমি দেখি না। ব্যাপারটা বিরোধিতা বা পক্ষে দাঁড়িয়ে যাবার বিষয় নয়। গ্রামীণ গণ মানুষের বিশাল একটি অংশের ক্ষোভ-বিক্ষোভের জায়গাগুলো নারী সমাজের বোঝা দরকার। তারা তাদের ক্ষোভ বিক্ষোভের কথাগুলো জানিয়েছে। এখন দরকার সেগুলো নিয়ে সমাজের অন্যান্য অংশের সাথে একটা ব্যাপক আলোচনার আয়োজন করা। সেদিক থেকে নারী আন্দোলনের কর্মী হিশাবে যে সকল দাবি নারীর জন্য প্রাসঙ্গিক আমি শুধু সেই দাবিগুলো নিয়ে কিছু কথা তুলব। কিন্তু আমার ভয় হয় এই ডায়লগ, ব্যাপক কথাবার্তা বা আলোচনার জন্য যে সময় প্রয়োজন তা আমরা দিতে চাই কি না। একটি পক্ষ মনে করে দাবী আদায়ের সময় নির্ধারণ করে দিয়ে কোন প্রকার আলোচনা ছাড়াই বলপ্রয়োগে সমাধান করতে হবে। অন্যদিকে এই দাবিগুলো ধর্মের মোড়কে ইসলামপন্থিদের পক্ষ থেকে তোলা হয়েছে বলেই নারীদের প্রথম প্রতিক্রিয়াই নেতিবাচক হয়ে গেছে। কিন্তু চোখ বন্ধ করে এর বিরোধী হতে হবে, এটাও কোন যুক্তি হতে পারে না। যে মোড়কেই আসুক মোড়ক খুলে মুল বিষয় নিয়ে আমাদের পরস্পর কথা বলতেই হবে। এখন সে সময় এসেছে। ধর্মের পুরুষতান্ত্রিক নির্যাতন নতুন কোন গল্প নয় যে নারীদের তা বোঝাতে হবে। সেটা করতে গিয়ে নারীকে কে ধর্মের বিপরীতে দাঁড় করানোর বিপদও আমাদের ভেবে দেখতে হবে। বেগম রোকেয়া তা অনেক আগেই এইসব বুঝিয়ে গেছেন। কিন্তু মুশকিল হয় যখন এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে নারী মুক্তির নামে দাঁড়াতে গিয়ে আমরা পুরুষতান্ত্রিক অবাধ বাজারব্যবস্থা ও নারীকে পণ্যে রূপান্তরের পক্ষে দাঁড়িয়ে যাই। আবার ধর্মীয় জায়গা থেকে তোলা দাবিদাওয়া বলে এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া রাবারের মতো ক্রমাগত টানতে গিয়ে জেনে বা না জেনে বাংলাদেশকে আরও ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে থাকি।

ধর্মের পুরুষতান্ত্রিক নির্যাতন নতুন কোন গল্প নয় যে নারীদের তা বোঝাতে হবে। সেটা করতে গিয়ে নারীকে কে ধর্মের বিপরীতে দাঁড় করানোর বিপদও আমাদের ভেবে দেখতে হবে। বেগম রোকেয়া তা অনেক আগেই এইসব বুঝিয়ে গেছেন। কিন্তু মুশকিল হয় যখন এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে নারী মুক্তির নামে দাঁড়াতে গিয়ে আমরা পুরুষতান্ত্রিক অবাধ বাজারব্যবস্থা ও নারীকে পণ্যে রূপান্তরের পক্ষে দাঁড়িয়ে যাই। আবার ধর্মীয় জায়গা থেকে তোলা দাবিদাওয়া বলে এর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া রাবারের মতো ক্রমাগত টানতে গিয়ে জেনে বা না জেনে বাংলাদেশকে আরও ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে থাকি।

ইতিমধ্যে রাজনৈতিক দল, নারী সংগঠন ও সামাজিক সংগঠনের কাছ থেকে অনেক প্রতিক্রিয়া এসেছে। তাদের একটি সাধারণ বক্তব্য হচ্ছে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা মানলে আমরা মধ্যযুগে ফিরে যাবো। কেমন করে? সেটা কিন্তু কেউ পরিস্কার বলছেন না। প্রথমত মধ্যযুগ বর্তমান যুগের চেয়ে মন্দ ছিল কিনা সেটা একটা তর্কের বিষয়। দ্বিতীয়ত কেউ মধ্যযুগে যেতে চাইলেই কি যেতে পারবেন? আমার মনে হয় না। তৃতীয়ত আমরা একটি বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে বাস করছি, হেফাজতে ইসলাম বা আমরা কেউই এর বাইরে নই। ফলে হেফাজতে ইসলাম বিশ্বব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত আমাদের কোন এক ‘মধ্যযুগে’ ফিরিয়ে নিতে পারবে এমন কোন সম্ভাবনা দেখছি না। বরং সমাজের গণমানুষের বিশাল একটি অংশ বিদ্যমান ব্যবস্থাকে কিভাবে দেখছে, কিভাবে সমালোচনা করছে এবং কিভাবে তার প্রতিকার খুঁজছে সেটা বুঝতে পারাই আমাদের প্রধান কাজ হতে পারে। আমাদের দরকার ধর্মীয় ভাষায় তোলা তাদের মুল বক্তব্য গুলো একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব, এবং কতটুকু অসম্ভব বা কেন সম্ভব নয় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে একটা সুস্থ আলোচনার দিকে নেয়া্র চেষ্টা করা। তাদের দাবিগুলো আদৌ সমর্থন করা যাবে কিনা, কিম্বা কতোটুকু করা যাবে তার তর্কবিতর্ক কিভাবে হতে পারে সেইসব আলোচনা করা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারাই গ্রামের গরীব নারী-পুরুষদের কাছে একটি প্লাটফর্ম হিসেবে হাজির হতে পেরেছে। কাজেই একে উপেক্ষা করা আমাদের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। আমি ধন্যবাদ জানাই হেফাজতে ইসলামকে। কারণ প্রথম ১৩ দফা হাজির করার পর সমাজের প্রতিক্রিয়ায় তাঁরা সাড়া দিচ্ছেন। তারা পত্রিকায় তের দফার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেই ব্যখ্যা থেকেও আমি দফা ৪ ও ৫ নিয়ে কিছু বিশ্লেষণ করতে চাই।

দফা নং ৪.ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার নামে সব বেহায়াপনা, অনাচার,ব্যভিচার, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, মোমবাতি প্রজ্বালনসহ সব বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করা।

এই দাবীকে ভাগ করলে অন্তত তিনটি ভিন্ন দাবী তৈরী করা যেতো। যেমন ১. ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতা, ২. বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ এবং ৩. মোমবাতি প্রজ্বলনসহ সব বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ।

অর্থাৎ এই ৪ নং দাবীটি পুরোটাই নারীদের বিরুদ্ধে নয়। মোমবাতি প্রজ্বালনসহ সব বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের অংশটি বাদ দিলে থাকে “বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ” অংশটি। এবং এই অংশটি নিয়েই চলছে বিতর্ক। আমার মনে হয় এই অংশটি হেফাজত বা কোন ইসলামী দলের কাছ থেকে না এসে যদি কোন রাজনৈতিক দল, কিংবা নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আসতো,আমরা একে স্বাগতই জানাতাম হয়ত। পুঁজিতান্ত্রিক ও পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অনেক নারী এই ধরণের সমস্যার শিকার হচ্ছেন, যা নারীকে পণ্য আকারে হাজির করছে। কেউ কেউ হয়তো স্বেচ্ছায় এমন পথ বেছে নিয়েছেন, কিন্তু তাদের কারণে অধিকাংশ নারীদের ওপর অপবাদ আসছে। ফলে এই অবস্থা পরিবর্তন করা প্রগতিশীল নারীদেরও দাবী হতে পারে,এবং হয়েছেও। এর সাথে নারীদের ঘর থেকে বের হবার বা না হবার কোন সম্পর্ক নেই। হেফাজতে ইসলামের এই দাবী থেকে অনেকে ভেবে নিয়েছেন তাঁরা নারীদের ঘর থেকেই বের হতে দিতে চান না। নারীদের কাজ করা বা শিক্ষার সুযোগ একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে। দেখা যাক, আল্লামা আহমদ শফি এই নিয়ে কী ব্যাখ্যা দিচ্ছেনঃ

“দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য নারীজাতির সার্বিক উন্নতির বিকল্পনেই। এ লক্ষ্যে তাদের নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মস্থল,সম্মানজনক জীবিকা এবং কর্মজীবী নারীদের ন্যায্য পারিশ্রমিকেরব্যবস্থা করতে হবে। ঘরে-বাইরে, কর্মস্থলে নারীদের ইজ্জত-আব্রু, যৌনহয়রানি থেকে বেঁচে থাকার সহায়ক হিসেবে পোশাক ও বেশভূষায়শালীনতা প্রকাশ এবং হিজাব পালনে উদ্বুব্ধকরণসহ সার্বিক নিরাপত্তানিশ্চিত করতে হবে; এবং একই লক্ষ্যে নারী-পুরুষের সব ধরনেরবেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে অবাধ ও অশালীন মেলামেশা,নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি, নারীর বিরুদ্ধে সর্বপ্রকার সহিংসতা,যৌতুক প্রথাসহ যাবতীয় নারী নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা কঠোর হাতে দমনকরতে হবে”।

এই ব্যাখ্যায় আমি মৌলিকভাবে কোন সমস্যা দেখি না। তবে শুধু এটা যেন না হয় যে শালীনতার একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা থাকবে, তার বাইরে অন্য পোষাক থাকবে না। ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের কিছু বিষয় হেফাজতে ইসলাম তুলে এনেছে, যা আমি এখানে উল্লেখ করলাম না। এ অভিযোগ সত্যি কিনা প্রশ্ন তোলা যেতে পারে, কিন্তু বিক্ষিপ্তভাবে কিছুটাও যদি সত্যি হয় তাহলে এমন প্রতিক্রিয়া আমরা ঠেকাতে পারবো না। আমরা কেউই কোন নারী-পুরুষের দৃষ্টিকটু বিচরণ চাই না, এমনকি উন্নত বিশ্বেও চায় না। এটা যার যার ব্যক্তিগত রুচির প্রশ্ন নয়, কারণ যে কোন সমাজে রুচির প্রশ্নেও একটা সামাজিক মানদণ্ড গড়ে ওঠে। সামাজিক মানদণ্ড নিপীড়নমূলক হলে মেয়েরা অবশ্যই আপত্তি করবে। ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যে একটা ভারসাম্য রক্ষা করেই সামাজিকতা গড়ে ওঠে। শাহবাগ নিয়ে অন্য প্রশ্ন তোলা হলেও যে সব নারী সামনের কাতারে আছে তাঁদের পোষাক নিয়ে আপত্তি তোলার কোন জায়গা আমি দেখি না। আল্লামা আহমদ শফি বলছেনঃ “আমাদের কথা পরিষ্কার যে, হিজাব বা শালীনতার সঙ্গে নারীদের নিরাপদপথ চলাচল, শিক্ষার্জন ও কর্মক্ষেত্রে যেতে কোনো বাধা নেই।”

তাঁদের আর একটি বক্তব্য ‘নারীদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য আলাদাবালিকা বিদ্যালয় বা মহিলা কলেজ থাকতে পারলে আলাদা কর্মক্ষেত্রপ্রতিষ্ঠার দাবিতে আপত্তি তোলার যুক্তি থাকতে পারে না’’ । এই দাবী কতখানি বাস্তব সম্মত হবে তা ভেবে দেখার বিষয়। আমরা নিজেরাও মনে করি প্রতিটি কর্মস্থলে নারীদের প্রয়োজনে কিছু আলাদা ব্যবস্থা অবশ্যই থাকতে হবে। বেশির ভাগ কর্মস্থল নারীকর্মীদের উপযোগী করা নয়। এবং সেটা হলে নারীরা কাজ করতে অনেক স্বাচ্ছন্দ বোধ করবেন। কিন্তু আলাদা কর্মস্থল সম্ভব হবে কিনা সেটা আমরা তাদের বিবেচনা করতে বলতে পারি।

আমরা কেউই কোন নারী-পুরুষের দৃষ্টিকটু বিচরণ চাই না, এমনকি উন্নত বিশ্বেও চায় না। এটা যার যার ব্যক্তিগত রুচির প্রশ্ন নয়, কারণ যে কোন সমাজে রুচির প্রশ্নেও একটা সামাজিক মানদণ্ড গড়ে ওঠে। সামাজিক মানদণ্ড নিপীড়নমূলক হলে মেয়েরা অবশ্যই আপত্তি করবে। ব্যক্তি ও সমষ্টির মধ্যে একটা ভারসাম্য রক্ষা করেই সামাজিকতা গড়ে ওঠে। শাহবাগ নিয়ে অন্য প্রশ্ন তোলা হলেও যে সব নারী সামনের কাতারে আছে তাঁদের পোষাক নিয়ে আপত্তি তোলার কোন জায়গা আমি দেখি না।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, চার নম্বর দাবীতে নারীদের ঘরে ঢোকানো হচ্ছে না, বরং নারীদের সুরক্ষার কথা বলা হচ্ছে ইসলামের বয়ানে। এই প্রস্তাবে ভীত না হয়ে আমাদের দেখতে হবে নারীদের বর্তমান অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রেখে নারীকে ভোগ্য পণ্য ভেবে যারা নির্যাতন করে, তাদের হাত থেকে আমরা কিভাবে মুক্ত হতে পারি। আমাদের সমস্যা হচ্ছে কেউ ধর্মের নামে নীতির কথা বললে ঘাবড়ে যাই যে তাহলে বুঝি ধর্মীয় গোঁড়ামীর মধ্যে পড়ে গেলাম। ‘বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার’, কারো কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়, তবে প্রতিটি সংস্কৃতি ও সামষ্টিক মূল্যবোধ সামাজিক ভাবেই এই সকল বিষয় নির্ধারণ করে। আমি আল্লামা আহমদ শফি এবং হেফাজতে ইসলামের অন্যান্য নেতা ও কর্মীদের অনুরোধ করবো এই বিষয়টি নারীর অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হোক, কোন আরোপিত নীতি হিশেবে নয়। শাসনের সুরে নয়। সমাজকে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে আরও বিকশিত করে নেবার দায়িত্ব আছে সকলেরই। সেই দিক থেকে আলোচনা করলে তা ইতিবাচক হবে। বিশ্বের অনেক দেশেই এখন নারীরা কাজ করছেন। মুসলিম নারীরা হিজাব পরে কিংবা না পরেও শালীনভাবে কাজে যাচ্ছেন এবং নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করছেন। তবে মনে রাখতে হবে, এ কথা কেউ হলফ করে এখনও বলতে পারবে না যে নারীর পোষাক পরিবর্তন হলে আপনা থেকেই ধর্ষণ বা যৌন হয়রানী বন্ধ হয়ে যাবে। এই বিষয়টির সাথে পুরুষদের মন মানসিকতা ও নারীর প্রতি ব্যক্তি ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী জড়িত। এটা যতোদিন সামাজিক আন্দোলন করে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে পরিবর্তন না করা যাবে ততদিন এই দুরাবস্থা চলতে থাকবে। তাছাড়া শালীনতা শুধু মেয়েদের বিষয় হতে পারে না। একই সঙ্গে পুরুষদের শালীন ও সংস্কৃতিবান হতে হবে। কিন্তু সেই দাবি হেফাজতে ইসলাম করে নি।

হেফাজতের সমাবেশে আসা নারী সাংবাদিকের ওপর আক্রমণ দিয়ে অন্তত এটা মনে হয় যে নারীরা আশে পাশে থাকলেই পুরুষরা তাদের আলাদা দৃষ্টিতে দেখেন। এবং সেটা ক্ষেত্র বিশেষে ধর্ষণে গিয়ে পর্যবসিত হয়। নাদিয়ার শারমিনের ক্ষেত্রে সৌভাগ্যক্রমে সেটা হয় নি, তবে তিনি অনেক বেশী আঘাত পেয়েছেন। এটাও শারীরিক আক্রমণ তবে ধর্ষণের মতো গ্লানিকর নয়। তার পোষাকে কোন অশালীনতা আমি দেখিনি। কিন্তু যারা আক্রমণ করেছেন তাদের কথা হচ্ছে শুধু-পুরুষদের একটি সমাবেশে নারী সাংবাদিক কেন এসেছেন? নারীদের শালীনতার প্রশ্নই যদি প্রধান হয় তাহলে কোন্‌ ধরণের সভায় নারী যাবে আর কোনটাতে যাবে না সেটাও কি ঠিক করে দেয়া হবে? আমি মনে করি বিষয়টি এতো চরম নিয়ন্ত্রণের দিকে নিয়ে যাওয়া উচিৎ হবে না। সাধারণভাবে বললে নারীদের পোশাক সম্পর্কে আমাদের সামাজিক যে প্রধান বোধবুদ্ধি ও সচেতনতা তা নিজে থেকেই যথেষ্ট শালীন ও ভারসাম্যপুর্ণ।এই দিকটাকে আমলে নিয়ে হেফাজতের নেতা কর্মীদের সতর্ক থাকার দরকার আছে। যেকোন জবরদস্তি উলটা ফল বয়ে আনতে পারে।

মিডিয়া কর্মীদের উপর আক্রমণ নিন্দনীয়। আবার এমন ঘটনা শুধু হেফাজতের সমাবেশেই নয়, অতি আধুনিকদের গানের কনসার্টেও হতে দেখেছি আমরা। যেখানে শুধুই পুরুষ। একা নারীর ওপর আক্রমন কোন ধর্মীয় কারণে নয়, পুরুষতান্ত্রিক কারণেই হয়।

মিডিয়া কর্মীদের উপর আক্রমণ নিন্দনীয়। আবার এমন ঘটনা শুধু হেফাজতের সমাবেশেই নয়, অতি আধুনিকদের গানের কনসার্টেও হতে দেখেছি আমরা। যেখানে শুধুই পুরুষ। একা নারীর ওপর আক্রমন কোন ধর্মীয় কারণে নয়, পুরুষতান্ত্রিক কারণেই হয়।

হেফাজতে ইসলামের পঞ্চম দাবী “ইসলাম বিরোধী নারীনীতি, ধর্মহীন শিক্ষানীতি বাতিল করে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা”। 
এখানেও একাধিক বিষয় টেনে আনা হয়েছে। আমি শুধু নারী নীতি প্রশ্নেই থাকতে চাই।

প্রথমেই বলে রাখা ভাল যে বাংলাদেশ সরকার কোন নারী নীতি ঘোষণা করেন নি, যেটা আছে সেটা হচ্ছে ‘নারী উন্নয়ন নীতি’।
 দাতারা যেভাবে বুঝেছে সেই দিক থেকে “উন্নয়নের” জন্যে নারীদের কোন্‌ কোন্‌ দিকগুলো প্রাধান্য দেয়া হবে তারই নীতি। কাজেই আমরা কোন্‌ নীতি নিয়ে বিতর্ক করছি তা আগে পরিস্কার থাকতে হবে।

তিন




নারী উন্নয়ন নীতি নিয়ে ভাল করে বুঝতে হলে আমাদের এর পেছনের কথা জানতে হবে। এই নীতি প্রণয়নের সাথে নারী আধিকার প্রতিষ্ঠার সম্পর্কের চেয়ে নারী উন্নয়নের সম্পর্ক অনেক বেশী। ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগে নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই সময় দেশের নারী সংগঠনগুলো একসাথে কাজ করেছিল। আমরা নিজেরাও সেই প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত ছিলাম। এর একটি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতও রয়েছে। ১৯৯৫ সালে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব নারী সম্মেলনের ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনার অংশ হিশেবে এই নীতি প্রণীত হয়। তার আগে ১৯৭৯ সালে জাতি সংঘের নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (CEDAW) গৃহিত হয়। বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৪ সালে চারটি ধারায় ২, ১৩(ক), ১৬(ক) ও (চ)সংরক্ষণসহ এ সনদ অনুসমর্থন করে। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে ধারা ১৩(ক) এবং ১৬.১ (চ)সংরক্ষণ প্রত্যাহার করা হয়। ধারা ২ হচ্ছে রাষ্ট্র সমুহের সংবিধান ও আইন সমূহে নারী-পুরুষের সমতার নীতি অনুসরণ। ধারা ১৩(ক) পারিবারিক কল্যাণের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। ধারা ১৬ হচ্ছে বিবাহ ও সকল পারিবারিক বিষয়ে নারী-পুরুষের সমান অধিকার; ১৬.১ স্বামী-স্ত্রীর অধিকার, সন্তানের ব্যাপারে পিতা-মাতার অধিকার, সন্তান গর্ভধারণে নারীর অধিকার ইত্যাদী মৌলিক বিষয়গুলো রয়েছে। ১৯৯৬ সালে ১৩(ক) এবং ১৬.১(চ) প্রত্যাহার করা হয়েছে। ১৬.১(চ) -এ অভিভাবকত্ব, দত্তক গ্রহণ, ট্রাস্টশিপ ইত্যাদী ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অধিকারের কথা রয়েছে।

সিডও সনদে স্বাক্ষর করেছিলেন হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ সরকার, বেইজিং কর্মপরিকল্পনায় স্বাক্ষর করেছিলেন বিএনপি সরকার; বেগম খালেদা জিয়া প্রধান মন্ত্রী হিশেবে বেইজিং গিয়েছিলেন। তারই আলোকে নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন করেছেন আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৭ সালে। ২০০৪ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার এই নীতিতে পরিবর্তন ঘটায় এবং নারী উন্নয়ন নীতি ২০০৪ প্রণয়ন করে। আবার ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংশোধিত আকারে নারী উন্নয়ন নীতি ২০০৮ প্রণয়ন করে। যদিও তারা সেটা বাস্তবায়ন করতে পারেন নি। কাজেই নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়নে সব সরকারই সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে। কারণ দাতাগোষ্ঠির কাছে নারী উন্নয়ন নীতি তাদের উন্নয়ন সহযোগিতার একটি অপরিহার্য অংশ।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার সময় অঙ্গীকার করলেও নারী উন্নয়ন নীতি ঘোষণা করেছে অনেক দেরীতে, ২০১১ সালে। প্রায় ৪১টি লক্ষ্য সামনে রেখে প্রণীত এই নীতিতে নারীর সম-অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিদ্যমান আইন সংশোধন ও প্রয়োজনীয় নতুন আইন প্রণয়ন করার কথা ছাড়া ধর্মীয় দিক থেকে আপত্তি তোলার মতো কিছুই নাই।

হেফাজতে ইসলাম নারী নীতি পুরোটার বিরোধিতার করছেন না, তাঁরা নারী নীতির ইসলাম বিরোধী ধারা বিলুপ্ত করতে বলছেন। আল্লামা আহমদ শফীর দেয়া ব্যাখ্যায় বলা হয়েছেঃ “ত্যাজ্য সম্পত্তিতে সম-অধিকারের আইনসহ নারীনীতির পবিত্র কোরআন-সুন্নাহবিরোধী ধারাগুলোই আমরা সংশোধনের দাবি করছি”। 
হেফাজতে ইসলাম যদি সর্বশেষ নারী নীতি (২০১১) পড়ে থাকেন তাহলে দেখবেন নারী উন্নয়ন নীতির ২৫.২ ধারায় বলা হয়েছে “উপার্জন, উত্তরাধিকার, ঋণ, ভূমি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রদান করা”। 
 এখানে অর্জিত সম্পদের ওপরই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বেশী। সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে পরিচ্ছন্ন বা স্পষ্ট ভাবে কিছু বলা হয় নি। বলাবাহুল্য, এই দিকটি একটি বিষফোঁড়ার মতো সমস্যা হয়ে রয়েছে। এই ক্ষেত্রে প্রচুর আলোচনা তর্কবিতর্কের প্রয়োজন আছে।

আমরা দেখেছি, জোট সরকারের নারী উন্নয়ন নীতি থেকে উত্তরাধিকার সম্পদ কথাটি বাদ দেয়া হয়েছিল, পরে ২০০৮ সালের তত্ত্ববাধায়ক সরকারের নারী উন্নয়ন নীতিতে উত্তরাধিকার শব্দটি না রেখে “স্থাবর ও অস্থাবর” শব্দ যোগ করা হয়। ২০০৮ সালে ওলামা মাশেয়খদের প্রতিবাদের কারণে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত খতিব মুফতি মুহাম্মদ নুরুদ্দিনকে প্রধান করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন করতে একটি কমিটি করে দেয়া হয়। এ কমিটি ২০০৮ সালের নীতিমালার ১৫টি ধারা কোরআন-সুন্নাহর পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন। এর মধ্যে তারা সিডও বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত ধারাটি বাতিলের সুপারিশ করেন (কালের কন্ঠ, ৭ মার্চ, ২০১০)।



আমরা দেখেছি, জোট সরকারের নারী উন্নয়ন নীতি থেকে উত্তরাধিকার সম্পদ কথাটি বাদ দেয়া হয়েছিল, পরে ২০০৮ সালের তত্ত্ববাধায়ক সরকারের নারী উন্নয়ন নীতিতে উত্তরাধিকার শব্দটি না রেখে “স্থাবর ও অস্থাবর” শব্দ যোগ করা হয়। ২০০৮ সালে ওলামা মাশেয়খদের প্রতিবাদের কারণে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত খতিব মুফতি মুহাম্মদ নুরুদ্দিনকে প্রধান করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন করতে একটি কমিটি করে দেয়া হয়। এ কমিটি ২০০৮ সালের নীতিমালার ১৫টি ধারা কোরআন-সুন্নাহর পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন। এর মধ্যে সিডও বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত ধারাটি বাতিলের সুপারিশও করা হয়।

নারী উন্নয়ন নীতির ব্যাপারে ২০০৮ সাল এবং ২০১১ সালে ওলামা মাশায়খরা প্রতিবাদ করেছেন এবং তাঁদের নিজস্ব মতামত তুলে ধরেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে তাঁদের কথা দিয়েছেন যে কোরআন -সুন্নাহ বিরোধী কোন আইন সরকার অতীতেও করে নি, ভবিষ্যতেও করবে না। তাঁর সাথে সুর মিলিয়ে কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীও বিভিন্ন সভায় বলেছেন কোরআন -সুন্নাহ বিরোধী কোন আইন করা হবে না। কিন্তু মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শিরীণ শারমিন চৌধুরী ১৯৯৭ সালে নীতিমালা অনুযায়ী উত্তরাধিকার বিষয়টি নতুন নীতিমালায় পুনর্বহাল করেন। বলা বাহুল্য তিনি নারী সংগঠনের সাথে পরামর্শ করেই করেছেন।ফলে দেখা যাচ্ছে, নারী উন্নয়ন নীতিতে উত্তরাধিকারের বিষয়টি সরকার আসলে কতখানি রাখছেন তা তাঁরা নিজেরাই নিশ্চিত নন। সরকার একদিকে নারী সংগঠন, অন্যদিকে ইসলাম পন্থীদের এ বিষয়ে অস্পষ্ট রেখে দিয়েছেন। নারী আন্দোলন মাঝখানে বিভ্রান্ত হয়েছে। যেটাই হোক, নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ পূর্ণাঙ্গ রূপে ঘোষিত হয়েছে বটে, কিন্তু বাস্তবায়ন পুরোপুরি হয় নি।

দেখা যাক, ইসলামি চিন্তাবিদ ও ওলামা মাশায়েখরা নারী উন্নয়ন নীতির মধ্যে কোন ধারাগুলোকে কোরআন -সুন্নাহ বিরোধী মনে করছেন। কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. মুহাম্মদ ইনাম উল হক এই ধারা গুলো চিহ্নিত করে লিখেছেন। তাঁর মতে ক. ১৬.১ বাংলাদেশ সংবিধানের আলোকে প্রণীত ও গণজীবনের সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা আনা সম্ভব নয়। ক. ১৬.৮ নারী-পুরুষের বিদ্যমান বৈষম্য নিরসন করার বিষয়টিই পরিস্কার নয়। গ. ১৭.৪ বিদ্যমান সব বৈষম্যমূলক আইন বিলোপ করা এবং আইন প্রণয়ন ও সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত কমিশন বা কমিটিতে নারী আইনজ্ঞদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রস্তাব কোরআন ও সুন্নাহ’র সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

হেফাজতে ইসলাম তাঁদের ১৩ দফায় এতো কথা বলেন নি, তাঁরা শুধু বলেছেন নারী নীতি ইসলাম বিরোধী। আমরা পত্র-পত্রিকায় আলেম সমাজের পক্ষ থেকে যে সমালোচনা দেখছি, হেফাজতে ইসলামও কি একই মতের কিনা তা আমরা জানি না। যদি হয়ে থাকেন তাহলে বলবো তাঁদের আপত্তি যেখানে সেটা নারী উন্নয়ন নীতিতে খুব জোরালো ভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি। কিন্তু নারী উন্নয়ন নীতির বিরোধিতা যেভাবে করা হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে হেফাজতে ইসলাম নারীদের সকল প্রকার উন্নয়নের বিরুদ্ধে, যা তাঁরা নন বলেই ইতিমধ্যে বিভিন্ন আলোচনায় তারা পরিস্কার করেছেন। তাহলে তাঁদের উচিত হবে এই ব্যাপারে হেফাজতের নারী সংগঠন ও অন্যান্য নারী সংগঠনের সঙ্গে মত বিনিময় করা। নারী আন্দোলন যখন দাবী করে নারী নীতি সব নারীদের জন্যে, সেখানে হেফাজতের পুরুষদের মতামত ছাড়াও হেফাজতের নারীদের মতামত শোনাও আমাদের প্রয়োজন। অন্যদিকে নারী্রা সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে যেভাবে এগিয়ে এসেছেন সেই বাস্তবতাকে মনে রেখেই আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। যেসব ক্ষেত্রে পশ্চিমা চিন্তার প্রভাবের কারণে নারী উন্নয়ন নীতির যেসব দিক আমাদের স্বার্থের প্রতিকুল বলে মনে হচ্ছে অবশ্যই সেগুলোর বিষয়ে সমালোচনা হতে পারে। কিন্তু ঢালাও ভাবে কোন কিছু বাতিল বা সমর্থন করা যাবে না।

হেফাজতের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের বিতর্কিত সিডও সনদ বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। এটা ঠিক যে আন্তর্জাতিক যে কোন সনদে পশ্চিমা দেশের চিন্তা চেতনার প্রাধান্য থাকবে এবং এর বিরুদ্ধে খোদ পশ্চিমা দেশের ধর্মীয় নেতারা শুধু নয়, আরও অনেকেই প্রতিবাদ করেছেন, বিশেষ করে পোপ ও ভ্যাটিকানরা খুশি নন। তার অর্থ হচ্ছে শুধু ইসলামী ওলামারাই নন অন্যান্য ধর্মের পক্ষ থেকেও সিডও সনদ গৃহীত হচ্ছে না। সিডও সনদ সংক্রান্ত তর্ক যথেষ্ট জটিল বিষয়। তবে জাতি সংঘের সনদ হিশেবে ধরে নিয়ে নিজ দেশের প্রেক্ষাপটে কিভাবে গ্রহণ করা যায় সে আলোচনা অবশ্যই আমাদের করতে হবে। সেই ক্ষেত্রে হেফাজতে ইসলামসহ সমাজের সকল স্তরের জনগণের অংশগ্রহণ জরুরী।

আশা করি নারী নীতি নিয়ে এই সকল বিভ্রান্তি আমরা নারীদের মধ্যে আরও আলোচনার মধ্যে সমাধান করতে পারবো। তার আগে নারীদের দুই পক্ষ হয়ে পরস্পরের বিরোধী অবস্থান নেওয়া কৌশলগত ভাবে ভুল হবে বলে আমি মনে করি।

Saturday, April 20, 2013

প্রথম আলোতে হাসনাত আব্দুল হাইয়ের আলোচিত


'টিভির ক্যামরার সামনে সেই মেয়েটি’

মেয়েটি অনেকক্ষণ ধরে তার পেছনে পেছনে ঘুরছে, সেই অনুষ্ঠান শেষে হলঘর থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকে যখন তার চারদিকে ভক্ত ও তদবিরবাজদের ভিড়। এত ছেলেমেয়ের মাঝখানে সাদামাটা প্রায় ময়লা কাপড়ে উসর-ধূসর চুল মাথায় বিদ্ঘুটে রঙের সালোয়ার-কামিজ পরা মেয়েটির প্রতি তার চোখ পড়ার কথা না, তবু পড়ল। এতে তিনি বিস্মিত হলেন এবং কিছুটা বিরক্তও। অনেকেই তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে। কেননা, তিনি শুধু একজন সেলিব্রিটি নন, ইংরেজিতে যাকে বলে ফেভার। তা অন্যের প্রতি দেখানোর মতো তার যথেষ্ট ক্ষমতাও আছে। সেলিব্রিটির পেছনে, ছেলেমেয়েরা ঘোরে মুগ্ধতার জন্য অথবা কিছু পাওয়ার আশায়। সংসারে সবারই কিছু না কিছু চাওয়ার আছে। জীবন যতই জটিল হচ্ছে, চাওয়ার তালিকা বেড়েই যাচ্ছে। চারদিকে প্রতিযোগিতার দৌড় জীবনকে আরও জটিল করে তুলছে।
মেয়েটি নাছোড়বান্দা, তিনি যতই তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, সে ঘুরে এসে দাঁড়ায় সামনে, প্রথম সারিতে না হলেও দ্বিতীয় কি তৃতীয় সারিতে। দেখতে সে সুশ্রী নয়, তবে তার চোখে-মুখে তীক্ষ একটা ভাব আছে, নতুন ছুরির মতো। তার চোখের নিচে ক্লান্তির কালো দাগ, মুখে একধরনের রুক্ষতা। আগে সেখানে যে কমনীয়তা ছিল তা মুছে ফেলেছে। ঠোঁট দুটি চকচক করছে, যেন গ্লিসারিন মাখানো। আসলে সে ঘন ঘন জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট ভিজিয়ে নিচ্ছে। গলার নিচে কণ্ঠি বের হয়ে এসেছে, ওপরের দিকে গলার মধ্যে কয়েকটি ভাঁজ, সেখানে ঘামের পানি জমে আছে রুপার চিকন হারের মতো। শুকনো খড়ের মতো চুল উড়ছে বাতাসে। প্রায় ময়লা সবুজ ওড়না লাল কামিজে জড়ানো শরীরের ওপরে একটা স্তন ঢেকে রেখেছে, বুকের অন্য পাশে ওড়না কামিজের কাপড়ের ওপর ছড়িয়ে রাখা, প্রায় সমতল দুই দিকেই, হঠাৎ দেখে ছেলে কি মেয়ে বোঝা যায় না। মেয়েটি বাংলাদেশের পতাকার রং দিয়েই সালোয়ার-কামিজ বানিয়েছে অথবা সেই রকম তৈরি করা কাপড় কিনেছে। আজকাল অনেকেই এভাবে কাপড় পরে, কিছুটা দেশপ্রেম দেখাতে, কিছুটা ফ্যাশন স্টেটমেন্টের জন্য। মেয়েটা দেখতে সুশ্রী না হলেও বয়সের জন্য একধরনের আকর্ষণ আছে তার শরীরে। অগোছালো বেশবাস সেই আকর্ষণে একটা বন্যতার ভাব সৃষ্টি করেছে, যেন সে যেখানে খুশি লাফিয়ে পড়তে পারে। দেখেই মনে হয় খুবই বেপরোয়া আর অ্যাগ্রেসিভ।
বুঝলেন স্যার, ওরা আমার সঙ্গে পলিটিকস করছে। সামনের সারিতে থাকতে দিচ্ছে না। অথচ এই কদিন আমি সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে থেকে স্লোগান দিয়েছি। আমার গলার স্বর এত উঁচু যে মাইক্রোফোনের বলতে গেলে দরকার হয় না। এক মাইল দূর থেকেই শুনে বুঝতে পারবেন এটা আমার গলার স্বর। মিটিংয়ের জন্য স্লোগানের দরকার, স্লোগানই মিটিং জমিয়ে তোলে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন। অভিজ্ঞ লোক আপনি। আমি কয়েক দিন মিটিং জমিয়ে রেখেছি শুধু আমার গলার জোরে স্লোগান দিয়ে দিয়ে। কাগজে আমার নাম এসেছে। টেলিভিশনে আমাকে প্রায়ই দেখিয়েছে। পাবনা থেকে দেখে আমার ছোট বোন ফোনে বলেছে, আপু তোকে দেখা গিয়েছে। কয়েকবার। তুই খুব মাতিয়ে রেখেছিস। আমার মাও প্রশংসা করেছেন দেখে। কেন করবেন না? নিজের মেয়ের খ্যাতিতে কোন মা গর্ব অনুভব করে না? বাবা? না, তিনি কিছু বলেননি। বেতো রুগি, বিছানায় শুয়ে থাকেন সব সময়। শুনেছি, ছোট বোনকে বলেছেন, ও ঢাকা গেল পড়াশোনা করতে। এখন মিছিল-মিটিং আর মানববন্ধন করে সময় নষ্ট করছে। ওর পড়াশোনার কী হবে? জমির ভাই তো পড়ার কথা বলেই ওকে নিয়ে গেলেন ঢাকায়। এখন এসব কী হচ্ছে? ওর ভবিষ্যৎ আমার চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
জমির ভাই, মানে আমার বাবার অনাত্মীয় জমির সাহেবকে জানেন স্যার? আমরা তাকে চাচা বলি। তিনি একজন রাজনৈতিক নেতা, মফস্বল শহর পাবনা থেকে শুরু করেছিলেন রাজনীতি, আস্তে আস্তে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ঢাকায় পৌঁছেছেন। বাবার সঙ্গে জানাশোনা অনেক দিন থেকে। আগে প্রায় প্রতিদিন আসতেন, ঢাকায় আসার পর যান মাঝেমধ্যে। একদিন আমাদের বাসায় এসে বললেন, তোমার বড় মেয়েটা বেশ চটপটে আছে। ওকে ঢাকায় পাঠাও। মফস্বলে থেকে কত দূর আর যেতে পারবে? এখানে কি-ই বা সুযোগ রয়েছে? এখন সবই তো ঢাকায়।
ঢাকায় গিয়ে কী করবে সীমা? ওর তো গ্র্যাজুয়েশনও হয়নি। বাবা বলেছিলেন।
শুনে জমির চাচা উত্তর দিয়েছিলেন, কেন? ঢাকাতেই গ্র্যাজুয়েশন করবে। সেই ব্যবস্থা করে দেব আমি। কলেজ ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে জানাশোনা আছে। বললেই অ্যাডমিশন হয়ে যাবে। হোস্টেলেও জায়গা পেতে অসুবিধা হবে না। সবই তো রাজনৈতিক দলের কন্ট্রোলে, যখন যারা ক্ষমতায় থাকে, তাদের। এখন আমরা আছি, সব সিদ্ধান্ত আমরাই নিই। কে অ্যাডমিশন পাবে, কার জন্য সিট খালি করাতে হবে—এ সবই আমাদের আওতায়। বুঝলেন না, একটা সিস্টেম তৈরি হয়ে গিয়েছে। বেশ সুন্দর চলছে। কেউ বাদ সাধছে না, কোনো হট্টগোল নেই। সবাই পাবে এই সুযোগ, পালা করে। বেশ গণতান্ত্রিক এই ব্যবস্থা। তা ছাড়া দলের কেউ না হলেও এসব সুযোগ পাওয়া যায়। একটু খরচ করতে হয় আর কি। সে যাই হোক, আপনার মেয়েটার দায়িত্ব আমি নিলাম। ও ঢাকায় যাবে, কলেজে ভর্তি হবে, হোস্টেলে থাকবে। পড়াশোনা করবে। মাঝেমধ্যে আমাদের পার্টি অফিসে এসে এটা-ওটা নিয়ে কাজ করে সাহায্য করবে।
কী কাজ করবে? কী নিয়ে সাহায্য করতে হবে সীমাকে? বাবার স্বরে উদ্বেগ ও ব্যাকুলতা।
তেমন কিছু না। ধরেন নেতার জন্য বক্তৃতা লেখা, প্যামফ্লেট তৈরি, প্রচার পুস্তিকা লেখা, ব্যানারের স্লোগান—এই সব আরকি। বড় ধরনের কোনো কাজ না, জটিলও না। খুব বেশি সময় দিতে হবে না তাকে। পড়াশোনার কোনো ক্ষতি হবে না।
বাবা শুনে আমার দিকে তাকিয়েছেন। মাথা নেড়ে বলেছেন, ও অমন কাজ আগে কখনো করেনি। পারবে না। তা ছাড়া ওই সব নিয়ে থাকলে পড়াশোনা লাটে উঠবে।
জমির চাচা আশ্বাস দিয়ে বললেন, কাজগুলো সব সোজা। লেখালেখি, তা-ও বাংলায়। ছোট ছোট আকারে। তাতে সময় বেশি লাগবে না। আর পড়াশোনার সময় তো সে এসব কাজ করবে না, অবসরে করবে। সন্ধ্যার পর। কখনো রাতে।
সন্ধ্যার পর, রাতে? বাবা খুব চিন্তিত হয়ে তাকিয়েছেন জমির চাচার দিকে। বলেছেন মাথা দুলিয়ে কাঁপা গলায়, শুনেছি, সন্ধ্যার পর ঢাকার রাস্তাঘাট নিরাপদ না। গুন্ডা-বদমাশ ঘুরে বেড়ায়। ইভটিজার পিছু নেয়।
আরে না। ওসব বাড়িয়ে বলে লোকে। ঢাকা রাজধানী, সেখানে আইনশৃঙ্খলা থাকবে না তো থাকবে কোথায়? অন্য সব মেয়ে থাকছে না ঢাকায়? কাজ করছে না, ঘোরাঘুরি করছে না? মজার ব্যাপার কি জানেন?
কী? বাবার চোখে একরাশ কৌতূহল এবং পুরোনো প্রশ্ন।
ঢাকায় মফস্বলের মেয়েরাই বেশি ফ্রি, বেশি দুরন্ত, বেশ সাহসী। ওরা কাউকে পরোয়া করে না। সব পার্টিতেই তারা আছে। টেলিভিশনে দেখেন না, মিছিলের সময় সামনে থেকে কেমন হাত তুলে জোরে জোরে স্লোগান দেয়। মফস্বলের মেয়েরাই ঢাকায় আন্দোলন জমিয়ে রাখে। বলতে গেলে ওরাই আসল কর্মী দল। ছেলেগুলো ফাঁকিবাজ। তারা মেয়েদের দিয়েই সব কাজ করিয়ে নিতে চায়। শুধু বাহবা আর টাকা নেওয়ার সময় সামনে থাকে। সব কাজের ক্রেডিট নেয়। জমির চাচা অনেকক্ষণ কথা বলে থামেন।
স্যার, কিছুই জানা ছিল না আমার, মফস্বলের মানুষ, তা-ও আবার মেয়ে। অল্প সময়ে অনেক কিছু শিখলাম। হয়তো আরও শেখার আছে। মেয়েদের সারা জীবনটাই জানার। ছাত্রী হয়েই থাকতে হয় সবকিছু জানার জন্য। অ্যাপ্রেন্টিস বলে না? আমরা হলাম তাই। কিন্তু আমি আর পারছি না স্যার। আমার একটা চাকরি দরকার। ভদ্রলোকের, ভদ্রমেয়ের মতো চাকরি। আপনি দিতে পারেন। আপনার তো সেই সুযোগ রয়েছে। আমার বেশি কিছু দেওয়ার নেই, সবই তো দেখতে পাচ্ছেন। প্রায় দেউলে হয়ে গিয়েছে শরীর আর মন। দেওয়ার মতো কিছু হয়তো একসময় ছিল, এখন তেমন কিছু নেই। মিথ্যে বলব কেন। আপনি অভিজ্ঞ লোক। সেলিব্রিটি।
তিনি বিরক্ত হয়ে বলেন, তোমার একটা দোষ আছে। তুমি বেশি কথা বল।
মেয়েটি শুনে মিইয়ে যায়। তারপর বলে, জমির চাচা কোথায়? আছেন, তিনি তার জায়গাতেই আছেন, দলের কাজ করছেন উঠে-পড়ে, দলে আরও কিছুটা ওপরে উঠতে পেরেছেন। অনেক ফন্দিফিকির জানেন তিনি। কী করে ডিঙিয়ে যেতে হয়, ওপরের মানুষকে তুষ্ট করতে হয়, সব জানা আছে তার। তিনি আরও ওপরে উঠবেন।
আমি? না, আমার পক্ষে ওপরে ওঠা সম্ভব হবে না। যেটুকু উঠেছি, ওই পর্যন্ত। মানববন্ধন করি, মিছিলে যাই, মঞ্চ তৈরি করে তার ওপরে উঠে গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিই। টেলিভিশনে দেখায়। কাগজে নাম ছাপা হয়। পাবনা থেকে ছোট বোন প্রশংসা করে ফোনে জানায়। মা-ও খুশি, তার মেয়েকে টেলিভিশনে দেখা যাচ্ছে, সবাই তার কথা বলছে। মা আমাকে নিয়ে গর্ব করেন বলে শুনেছি।
পড়াশোনা? হ্যাঁ, জমির চাচা তাঁর কথা রেখেছিলেন। কলেজে অ্যাডমিশন হয়েছে। হোস্টেলে শেয়ারে সিট পেয়েছি, মানে দুজনে একসঙ্গে থাকতে হয়। ক্লাস বেশি হয় না, প্রায়ই বন্ধ থাকে। আমরাও ফুরসত পাই না। হরতাল, মিটিং, মিছিল। মঞ্চে উঠে স্লোগান দেওয়া। এতে অনেক সময় চলে যায়। তবে কলেজে নামটা আছে খাতায়। হোস্টেলে সিটটা আছে এখনো। কেউ আপত্তি করে না, কেন করবে? প্রায় সবাই তো আমার মতো অবস্থার। কারও অনুগ্রহে অ্যাডমিশন আর সিট পাওয়া। সন্ধ্যার পর পড়াশোনা? না, সেটা প্রায় কারোরই হয় না। সবাই কিছু না কিছু নিয়ে ব্যস্ত, টাকার ধান্দায় ঘোরে। আমি পার্টি অফিসে যাই। কখনো একা, কখনো ছাত্রনেতাদের সঙ্গে। জমির ভাইয়ের অফিসে বসে বক্তৃতা লিখি, কখনো লিফলেট। কম্পিউটারে প্রিন্ট আউট বের করে দেখাই। তিনি প্রুফ দেখে দেন। আবার টাইপ করি। এসব কাজ ছেলেরা করতে চায় না। তারা মারধর, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ভাঙচুর—এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কাজ শেষ হলে আড্ডা দেয়, ড্রিংক করে একসঙ্গে বসে।
ড্রিংক? না, না। চা-টা না। অ্যালকোহল। হুইসকি। বিয়ার। আমাকেও খেতে হয়েছে পাল্লায় পড়ে। ওদের সঙ্গে থাকতে হলে তাদের সমর্থন পাওয়ার জন্য নানাভাবে সঙ্গ দিতে হয়। এড়ানোর উপায় নেই। ওরা নেতাদের কাছে নালিশ করলে আমাদের ভাতা বন্ধ। দেড় হাজার টাকা ভাতা পাই আমি অফিস থেকে, তাই দিয়ে কলেজে পড়া, হোস্টেলে থাকা। খুব মূল্যবান সেই ভাতা। বোকামি করে হারাতে পারি না। তাহলে যে পথে বসব।
জমির ভাইকে বলোনি কেন এসব? কী যে বলেন! তিনি কি ধোয়া তুলসি পাতা? তিনিও ড্রিংক করেন। রাতে কাজ শেষ হয়ে গেলে অফিসে বসেই করেন। আমাকেও খেতে হয়েছে তার সঙ্গে। আদর করে জড়ানো গলায় বলেছেন, খাও, খাও। ভালো জিনিস। স্বাস্থ্য ভালো থাকে। এনার্জি বাড়ায়। এত পরিশ্রম করার পর দরকার আছে এটার। সাহেবরা তো খারাপ জিনিস তৈরি করেনি। অল্প অল্প খাও, তাহলে বেসামাল হবে না। একটু সামলে চলতে হবে, হাজার হোক এটা পার্টি অফিস। বেসামাল হতে চাও তো আমার বাসায় এসো। তোমার ভাবি? আরে সে থাকলে তো! কেউ নেই, বাসা খালি। মারা গিয়েছে? না, মারা যাবে কেন? মেয়েরা অত তাড়াতাড়ি মরে না। এই ঝগড়া করে চলে গেল আরকি। বলল, রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ঘর করা পোষাবে না তার। কয়েক বছর একসঙ্গে থাকার পর এই কথা বলা। এত দিন যখন সহ্য করতে পেরেছে, তখন বাকিটাও পারত। কোনো মানে হয় হঠাৎ করে এসব কথা বলার? যারা দেশের জন্য খাটছে দিন-রাত, তাদের কিছু খামখেয়ালি, নিয়ম ভেঙে চলা—এসব সহ্য করতে না পারলে চলবে কেন? শুনল না মেয়ে মানুষটা। চলে গেল। যাক গে। বেশ আছি। হাত-পা ঝাড়া। চাকর আছে, রাঁধুনি আছে বাসায়। খাওয়া-দাওয়ার অসুবিধা হচ্ছে না, ঘুমোবার সময় বেশ ঘুমোচ্ছি। হ্যাঁ, তোমার যখন খুশি যেতে পারো। ওদের বললেই তোমাকে খেতে দেবে। দোকানে দোকানে সব সময় খাওয়া ভালো না লাগারই কথা। সেই তো বিরিয়ানি, নয়তো পরোটা-গোশত। কত দিনের পুরোনো কে জানে। স্বাদ বদলের জন্য এসো আমার বাড়ি মাঝে মাঝে। যখন খুশি। আমি বলে রাখব। জমির চাচা বললেও আমি সঙ্গে সঙ্গে তার বাসায় যাইনি। আমার মনে বেশ সন্দেহ জমেছিল। আস্তে আস্তে লোকটার চেহারা খুলে যাচ্ছিল আমার সামনে।
জমির চাচা নিজেই একদিন নিয়ে গেলেন তার বাসায়। প্রায় জোর করেই ড্রিংক করালেন ড্রয়িংরুমে বসে। সেদিন বেশিই খাওয়া হয়ে গিয়েছিল, তারই চাপে। ড্রিংকের পর পোলাও-কোর্মা খাওয়া হলো। খুব ফুর্তি লাগছিল। অমন মজা করে খাইনি অনেক দিন। তিনি যখন অনেক রাতে বললেন, দেরি হয়ে গিয়েছে। এখন হোস্টেলে যাওয়া ঠিক হবে না। থেকে যাও এখানে।
তাঁকে বেশি করে বলতে হলো না। থেকে গেলাম প্রায় স্বেচ্ছায়। সেই শুরু। তারপর বেশ কয়েক দিন হয়েছে অমন, একসঙ্গে ড্রিংক করা, খাওয়া আর ঘুমানো। দলের ছেলেরা তো বোকা না, টের পেয়ে গিয়েছে। ঠাট্টা করেছে, মিসট্রেস বলে। গায়ে মাখিনি। এমন ভাব করেছি, যেন শুনতেই পাইনি। ওরা ঠাট্টা করা বন্ধ করেনি।
জমির চাচাকে কেন বলিনি ওদের কথা? এই জন্য বলিনি যে জমির চাচা ওদের কিছু বলবেন না। তাদের নিয়ে কাজ করতে হয় তাকে।
তিনি রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছেন, অনেক জায়গাজুড়ে মঞ্চ। রাস্তায়, ফুটপাতে মানুষের ভিড়। অল্প বয়সের ছেলেমেয়েই বেশি। স্লোগান উঠছে থেকে থেকে, কোলাহল বাড়ছে। তিনি সীমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি মঞ্চে যাবে না আজ? স্লোগান দিতে?
না। ছাত্রনেতারা পলিটিকস করছে আমার সঙ্গে। বলছে, তাদের খাদ্য হতে হবে। শুধু জমির চাচার একার খাদ্য হলে চলবে না। রাতের বেলা মঞ্চের আশপাশে তাদের সঙ্গেও শুতে হবে। তাহলেই হাতে মাইক্রোফোন দেবে, নচেৎ নয়।
শুনে তিনি অবিশ্বাসের চোখে তার দিকে তাকান। রাস্তার স্লোগান ক্রমেই জোরালো হয়। তিনি সীমা নামের মেয়েটিকে বলেন, মাইক্রোফোন ওরা কন্ট্রোল করে? ওরাই ঠিক করে কে কখন স্লোগান দেবে?
তা নয় তো কী? ওরাই তো মঞ্চের নেতা। ওদের কথা যারা মানবে না, তারা হাতে মাইক্রোফোন পাবে না। গলা যত সুন্দরই হোক। আমার মতো ভরাট গলা হলেও চান্স পাবে না। মেয়েটি হঠাৎ তার দিকে তাকিয়ে বলল, শুনবেন স্যার? একটা স্লোগান দেব? আমার ভরাট গলায়?
না, না। দরকার নেই। এমনিতেই বুঝতে পারছি তোমার গলা বেশ ভরাট। রেডিও, টিভি অ্যানাউন্সারদের মতো, নিউজ রিডারের মতো।
মেয়েটি খুব খুশি হয় শুনে। হাসিমুখে বলে, সত্যি বলছেন স্যার? টিভি অ্যানাউন্সার, নিউজ রিডারের মতো? বলতে বলতে মেয়েটির চোখ ভিজে এল। ধরা গলায় বলল, আমার মতো অধঃপতিত মেয়ের ভাগ্যে কি তা হবে কখনো? হতে পারত যদি খারাপ হয়ে না যেতাম। ভালো পথে চলতাম। ভালো লোকের সঙ্গে মিশতাম। কিন্তু তা কী করে সম্ভব? আমার মতো অবস্থার একটা মেয়ে ভালো পথে কী করে চলবে? ভালো মানুষের সঙ্গ সে কোথায় পাবে? হাজার চেষ্টা করলেও তা হবে না। পাবনা থেকে ঢাকা অনেক দূরের পথ। আমি তো জানি পথের বাধাগুলো কোথায় কোথায় দাঁড়িয়ে। না, অত বড় কিছুর কথা ভাবতে পারি না আমি এখন। ছোটখাটো একটা চাকরি পেলেই বর্তে যাব। যেকোনো কাজ, যা ভদ্রভাবে চলতে দেবে, সুন্দরভাবে থাকতে দেবে। আচ্ছা স্যার, আপনার টেলিভিশন চ্যানেলে লেখাটেখার কোনো কাজ নেই? আমি খুব ভালো বাংলা লিখি। কবি শামসুর রাহমানের ওপর লেখা আমার কয়েকটা প্রবন্ধ আছে। অনেকে প্রশংসা করেছিল। আরও কয়েকটা লিখে একটা বই বের করব ভেবেছিলাম। কিন্তু সময় হলো না। ইচ্ছেটা এখনো আছে।
জমির চাচাকে বলব? তিনি উড়িয়ে দেবেন কথাটা। বলবেন, কবি-টবিদের ওপরে বই লিখে কী হবে? তার চেয়ে আমাদের দলের ওপর লেখো। দলের নেতাদের ওপর লেখো। তারপর একটু থেমে বলেছেন, তোমার অসুবিধা কোথায়? এই সব কথা তোমার মাথায় ঢোকে কেন? মাসে তিন হাজার টাকা পাচ্ছ। সেই টাকায় কলেজের ফি, হোস্টেলের খরচ দিচ্ছ। এই বয়সে এর চেয়ে ভালো চাকরি আর কী হতে পারে? তাও আবার পার্টটাইম। পরীক্ষায় পাস করার পর বেশি বেতনে চাকরি পেয়ে যাবে, তখন তুমি শুধু শামসুর রাহমান কেন, সব কবিদের নিয়ে লিখবে। এখন তোমাকে আমার অফিসের কাজের জন্য বেশি দরকার। ছাত্রনেতারা হাসি-ঠাট্টা করে? তা একসঙ্গে করলে বন্ধুরা অমন করবেই, গায়ে না মাখালেই হলো অথবা হেসে উড়িয়ে দেবে। আর শোনো, আমাকে না বলে ছাত্রনেতাদের সম্পর্কে কিছুই বলতে যাবে না। ওরা রেগে গেলে সবকিছু করতে পারে। দল ভেঙে অন্য কোথাও যাওয়ারও চেষ্টা কোরো না। দলের ছেলেরা সেটা সহ্য করবে না। ওরা সাংঘাতিক কিছু করে ফেলবে। দলের ছেলেমেয়েদের দলে রাখা তাদের জন্য একটা প্রেসটিজের ব্যাপার। ইচ্ছে করলেই কাউকে চলে যেতে দেওয়া যায় না। ঢোকা সহজ, বেরোনো কঠিন। বুঝলে? মাথা ঠিক রেখে কাজ করো। সমস্যা হলেই আমার কাছে চলে আসবে, খোলাখুলি সব বলবে।
জমির সাহেব মঞ্চের ছেলেদের বলছেন না কেন তোমাকে মাইক্রোফোন দেওয়ার জন্য? তিনি মেয়েটিকে জিজ্ঞাসা করেন।
বলছেন না এই জন্য যে তিনি তাদের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে চান না। তা ছাড়া ব্যাপারটা নাটকের মতো। পেছন থেকে প্রম্পটার যা বলছে, তাই নিয়ে স্লোগান হচ্ছে, সে অনুযায়ী সবকিছু চলছে। বাইরে থেকে কিছু বোঝা যায় না। জমির চাচা মঞ্চের পেছন থেকে সামনে আসতে যাবেন কেন? তিনি এবং তার বন্ধুরা টাকা দিয়ে যাচ্ছেন, খাওয়ার প্যাকেট পাঠাচ্ছেন। মঞ্চ চালু থাকছে, মিছিল বের হচ্ছে। ব্যস, এতেই তারা সন্তুষ্ট। একটা মেয়ের জন্য তিনি কিংবা তার সহকর্মীরা ছাত্রনেতাদের খেপাতে যাবেন কেন? নিজের দুর্বলতা থাকলে এমনই হয়। না, জমির চাচাকে বলে কিছু হবে না। সে আমার জানা আছে। হাতে মাইক্রোফোন পাওয়ার একটাই উপায়। ছাত্রনেতাদের কথা শুনতে হবে। সোজা কথায়, তাদের খাদ্য হতে হবে। হ্যাঁ স্যার, আমার মতো মেয়েরা সবাই খাদ্য। তারা মেনে নিয়েছে, ইচ্ছায় এবং অনিচ্ছায়। কী করবে? বাবার এত টাকা নেই যে তার খরচে ঢাকায় থাকবে। চাচা নেই, মামা নেই যে সাহায্য করতে পারেন। একমাত্র জমির চাচারা আছেন। তারা আগ বাড়িয়ে সাহায্য করতে আসেন। বড় মিষ্টি তাদের ব্যবহার। প্রায় অপত্যস্নেহে তাঁরা সঙ্গে নিয়ে ঘোরেন।
মেয়েটি প্রসঙ্গ বদলায়। বলে, আপনাকে টেলিভিশনে দেখেছি, টকশোতে আপনার কথা শুনেছি। আপনাকে অন্য রকম মনে হয়েছে। মানে অন্য পুরুষদের মতো না। আমার ভুলও হতে পারে। কিন্তু সত্যিই আপনাকে দেখে আমার এমন মনে হয়েছে। তা স্যার, পারবেন আমার জন্য কিছু করতে? বড় কিছু না। মঞ্চের আড়ালেই থাকব, লেখালেখি কিছু থাকলে করে দেব। টেলিভিশনেও লেখার কাজ নিশ্চয়ই আছে?
এই বইটা থেকে পড়ব? কতটুকু? এক প্যারা? বেশ পড়ছি। বলে মেয়েটি পড়তে থাকে এক মনে। পড়া শেষ হলে সে তাকে বলে, ক্যামন হলো স্যার? স্লোগান দিয়ে দিয়ে গলাটা ভেঙে গিয়েছে। নরমাল হলে আর একটু ভালো হতো। তা লেখালেখির কাজের জন্য তো গলার স্বরের দরকার নেই। আমার লেখা প্রবন্ধগুলো আপনাকে দেব। কবি শামসুর রাহমানের ওপর লেখা প্রবন্ধ। আমার খুব প্রিয় কবি ছিলেন। ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতাটি পড়লেই আমার গায়ের রোমকূপ দাঁড়িয়ে যায়। আমি প্রবন্ধগুলো আপনার অফিসে গিয়ে দিয়ে আসব। আপনার কাছে পৌঁছাবে কি না কে জানে। কত রকমের সিকিউরিটি আপনাদের অফিসে। তবু আমি দিয়ে আসব।
তিনি পকেট থেকে মোবাইল বের করে চোখের সামনে নিয়ে একটা নম্বরে টিপ দিলেন। তারপর ওপাশে কণ্ঠস্বর শোনা যেতেই তিনি বললেন, একটা মেয়ে যাবে অফিসে। নাম সীমা। ওর একটা অডিশন নেবে। হ্যাঁ, সে একটা কিছু পড়ে যাবে, যা তোমরা তাকে দেবে। শোনার পর নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে। তারপর আমাকে তোমাদের মত দেবে। হ্যাঁ, আমিও শুনব তার রেকর্ড করা অডিশন।
স্যার, আমি টেলিভিশনে অডিশন দেব? সত্যি বলছেন? না, না ঠাট্টা করবেন না আমার সঙ্গে। আমি এর মধ্যেই জীবনে অনেক কষ্ট পেয়েছি। আর বাড়াতে চাই নে কষ্টের বোঝা। স্যার, চাকরি না দেন, আমার সঙ্গে ঠাট্টা করবেন না। আমি মফস্বলের সামান্য একজন মেয়ে, তার ওপর আবার অধঃপতিত। পড়ে গেলে নাকি ওঠা কঠিন। আমি একটু দেখতে চাই, পড়ে গেলেও ওঠা যায় কি না, তার জন্য ছোট একটা সুযোগ দেন শুধু।
তিনি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি খুব বেশি কথা বল।
শাহবাগ চত্বর লোকে লোকারণ্য। সব বয়সের মানুষ নর-নারীতে ভরে গিয়েছে সব রাস্তা, ফুটপাত। সবাই ব্যগ্র হয়ে তাকিয়ে আছে দক্ষিণের দিকে, যেখানে জাতীয় জাদুঘর, পাবলিক লাইব্রেরি আর তারপর আর্ট ইনস্টিটিউট। হকাররা ভিড়ের মধ্যে নানা ধরনের জিনিস বিক্রি করছে। খেলনা, খাবার জিনিস—সবই। লাল আর সাদা হাওয়াই মিঠাইয়ের পেজা তুলার মতো ফাঁপানো শরীর প্লাস্টিকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। বাবার কাঁধে চড়ে একটা শিশু হাওয়াই মিঠাই খাচ্ছে, কাঁধে চড়েই কেউ বাতাসে খেলনা নাড়ছে। বাঁশি বাজাচ্ছে এক হকার, গলায় ঝোলানো ঝোলায় বিক্রির বাঁশি। শুকনো মিষ্টি বিক্রি করছে ঠেলাওয়ালা। বাতাসে ভাজা-পোড়ার গন্ধ। শিশুপার্কের সামনে এক চিলতে জায়গায় ফকির আলমগীর তাঁর দল নিয়ে লালনসংগীত গাইছেন ফিউশন সুরে।
একটু পরে আর্ট ইনস্টিটিউট থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হলো। সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ের মধ্যে ঢেউয়ের মতো একটা চঞ্চলতা আছড়ে পড়ল। পেপিয়ার-ম্যাশে তৈরি মস্ত বড় বাঘ, প্যাঁচা, ময়ূর মাথার ওপরে তুলে এগিয়ে আসছে শোভাযাত্রার ছেলেমেয়েরা। উত্তেজনায় ফেটে পড়ছে যেন, চঞ্চল হয়ে উঠেছে ভিড়ের মানুষ। গরমে ঘামছে সবাই, লাল হয়ে এসেছে মুখ। ধুলো উড়ছে, বাতাসে রোদের ঝাঁজ।
মেয়েটি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে বলছে, ‘নতুন বর্ষকে স্বাগত জানিয়ে এগিয়ে আসছে মঙ্গল শোভাযাত্রা। এতক্ষণ যারা অধীর প্রতীক্ষায় ছিল, হাজার হাজার সেই সব নর-নারী শিশু-কিশোরের প্রতীক্ষা শেষ হলো। গান শোনা যাচ্ছে, এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।’ বলতে বলতে মেয়েটির স্বর ক্রমেই উঁচু হলো। এত কোলাহল, গানের চড়া সুর, তার ভেতরে মেয়েটির কণ্ঠস্বর স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সে পরেছে লাল পেড়ে সাদা সুতির একটা শাড়ি। তার এক হাতে ছোট গাঁদা ফুলের মালা বালার মতো জড়িয়ে।

Sunday, April 14, 2013

নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে বিক্ষোভে





নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে বিক্ষোভ বিস্তারিত




নিউ ইয়র্ক: বাংলাদেশে ন্যায় বিচার ও শান্তির দাবীতে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের টাইমস স্কয়ারে আমেরিকার মুসলিম সংগঠনগুলোর এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ১৩ এপ্রিল শনিবার আমেরিকানস ইউনাটেড ফর হিউম্যান রাইটস এ বিক্ষোভ সমাশের আয়োজন করে। সমাবেশ শেষে টাইমস স্কয়ারে বিক্ষোভকারীরা এক র‌্যালী বের করে। 



বিক্ষোভে বাংলাদেশে চরম মানবাধিকর লংঘন, ট্রাইবুনালের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে দেশটির শীর্ষস্থানীয় ইসলামী নেতৃবৃন্দসহ বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে মৃত্যুদন্ড দেয়ার প্রক্রিয়া এবং গণহত্যার প্রতিবাদ জানানো হয়। এছাড়াও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের মুক্তির দাবী করা হয়। এসময় আমেরিকান মুসলিম নেতারা বার্মার আরাকান প্রদেশে মুসলিম নিধন বন্ধের আহবান জানান। অনুষ্ঠিত সমাবেশে বাংলাদেশী আমেরিকানদের সামাজিক, ধর্মীয় ও কমিউনটি সংগঠন ছাড়াও মূলধারার বিভিন্ন সংগঠনসহ ১২ টি আমেরিকান মুসলিম সংগঠনের ৮/১০ হাজার নেতা কর্মী অংশ নেয়। 
কেয়ার এর এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর নিহাদ আওয়াদ বলেন, আমি আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জামায়াত করিনা। একজন আমেরিকান মুসলমান হিসেবে বাংলাদেশের মুসলমানদের পক্ষে কথা বলছি। দেশটি মুসলমানরা নির্যাতিত হচ্ছে। সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম দেশ হওয়ার পরও ইসলাম ও রাসূল (সাঃ) এর কুৎসা রটনা করা হয়। রাসূল (সাঃ) কে কটাক্ষকারীদের বিচার দাবী নিয়ে দেশটির মুসলমানরা আন্দোলন করে যাচ্ছে। আন্দোলকারী মুসলমানদের উপর সরকারী বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালিয়ে  হত্যা করা হচ্ছে। গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের উপর নির্যাতন করা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতা বিরোধী অপরাধের গঠিত ট্রাইবুনাল কার্যক্রম ইতোমধ্যেই বিতর্কিত হয়ে পড়েছে। ট্রাইবুনালের একটি রায় নিয়ে দেশী সহিংসতায় গণহত্যার ঘটনা উদ্বেগজনক। ৪২ বছর আগের ঘটনার বিচার করতে গিয়ে সংঘাতময় পরিস্থিতি কোন ভাবেই কাম্য হতে পারেনা। আমরা বাংলাদেশে শান্তি ও মুসলমানদের প্রতি ন্যায় বিচার চাই। 
তিনি বলেন, ট্রাইবুনালের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে মনে হচ্ছে ইসলামী সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে হত্যার করার জন্য ৪২ বছর পূর্বের একটি ইস্যুকে সামনে আনা হয়েছে। 





ইসলামিক সার্কেল অফ নর্থ আমেরিকা-ইকনার আমীর নাঈম এম বেগ বলেন, বিশ্ববিখ্যাত আলেম মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদন্ডের রায় ঘোষণা শুরু করার পর সারা দেশে প্রতিবাদের যে ঝড় উঠেছে তা দমন করতে গিয়ে গত ফেব্রুয়ারী ও মার্চ মাসে সরকার গণহত্যা চালিয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের নির্বিচার গুলিবর্ষণে ২ শতাধিক নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, কয়েক হাজার লোক আহত হয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে এবং অসংখ্য মানুষকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে বিনাবিচারে কারাগারে আটক রাখা হয়েছে। 
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন করে বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনের উপর দোষ চাপানো হচ্ছে। বক্তারা স্বাধীন বিচার কমিশন গঠণ করে এসব হত্যার তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার দাবী জানান। 
মুসলিম উম্মাহ অফ নর্থ আমেরিকা-মুনার ন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট আবু আহমেদ নূরুজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকার বিরোধী শক্তির ১ লাখের অধিক নেতা কর্মীকে মামলা দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করেছে। এছাড়াও প্রতিনিয়ত বিরোধী শক্তির নেতা কর্মীদের গুম ও খুন করা হচ্ছে। এক কথায় দেশটিতে চরম মানবাধিকার লংঘন হচ্ছে। তাই একজন আমেরিকান মুসলমানরা মানবাধিকার রক্ষার জন্য বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাড়িয়েছে। 



তিনি আরো বলেন, ৪২ বছর আগে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত অপরাধের দায়ভার পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের এবং সেসময় যারা দেশটির পরিচালনায় নিয়োজিত ছিলেন সেসব বেসামরিক লোকদের। স্বাধীনতার পর পর বাংলাদেশ সরকার চিহ্নিত ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে ভারতের মধ্যস্থতায় ১৯৭৪ সালে মুক্তি দিয়েছে। দীর্ঘ চার দশক পর সরকার তার প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যার তীর ছুঁড়ে তাদেরকে ঘায়েল করতেই প্রহসনে বিচারের ব্যবস্থা করেছে। অবিলম্বে তথাকথিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাতিল করে ইতোমধ্যে যেসব নেতার বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডাদেশ দেয়া হয়েছে তাদের দন্ড প্রত্যাহার ও ট্রাইব্যুনাল বাতিল করে বর্তমান সংকট নিরসনের মাধ্যমে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে একটি ট্রুথ এন্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠণ করে সমঝোতায় উন্নীত হওয়ার আহবান জানান।



আমেরিকানস ইউনাইটেড ফর হিউম্যান রাইটস এর সভাপতি মোবাশ্বির রহমান বলেন, বাংলাদেশ সরকারকে আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে জাতিসংঘের তত্বাবধানে বসনিয়া, রুয়ান্ডা, সিয়েরা লিওনের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের অনুরূপ নতুন ট্রাইব্যুনাল গঠণ করে প্রকৃত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিচার করার উদ্যোগ নেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রতি আহবান জানান। 
তিনি বলেন, বর্তমান ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম বিচার প্রক্রিয়া বহির্ভূত ও বিদেশে অবস্থানরত একজন অজ্ঞাত পরিচয় আইনজীবীর সাথে স্কাইপে ও ই-মেইলের মাধ্যমে বিচার সম্পর্কিত আলোচনা এবং নির্দেশনা নিয়ে ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য প্রমাণ করেছেন। এধরনের কেলেঙ্কারির পর এই আদালতের অস্তিত্ব বজায় রেখে নির্দোষ লোকদের হত্যা করার ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাওয়া কোন মতেই মেনে নেয়া যায় না। 
সমাবেশে থেকে বক্তারা মায়ানমার সরকারের ছত্রছায়ায় রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর গত কয়েক দশক যাবত নিপীড়ন চালানো এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর নাগরিক অধিকার অব্যাহতভাবে অস্বীকার করে যাওয়া এবং তাদের ধর্মীয় স্থাপনা একের পর এক ধ্বংস করার চেষ্টার প্রতিবাদ করে তাদেরকে মায়ানমারের নাগরিকত্ব প্রদানের আহবান জানান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করে মাওলানা জুলকিফুল চৌধুরী। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ আবু সামীহাহ সিরাজুল ইসলাম ও নতুন প্রজন্মের আকিব আজাদের পরিচালনায় স্বাগত বক্তব্য আমেরিকানস ইউনাইটেড ফর হিউম্যান রাইটস এর সভাপতি মোবাশ্বির রহমান। 



সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন, কেয়ার নিউ ইয়র্কের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াদ রামাদান, মজলিস আস শুরার আমীর ইমাম আলহাজ্ব তালিব আবদুর রশীদ, মুনার ন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন, ইন্টারনেট ইসলামিক ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ জহিরউদ্দিন, হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট ফর বাংলাদেশ-এইচআরডিবির প্রেসিডেন্ট মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, ওম্যান রাইটস এন্ড ডেভেলপমেন্ট ফর বাংলাদেশ এর চেয়ারপার্সন শাহানা মাসুম, পার্ক আমেরিকান সোসাইটির প্রেসিডেন্ট শামস উজ জামান, মজলিস আস শুরার জাষ্টিস ডিপার্টমেন্টের চেয়ারপার্সন ইমাম আইয়ুব আবদুল বাকী, মজলিস আস শুরার সাবেক আমীর ইমাম আল আমীর আবদুল লতিফ, বাইস এর শুরা সদস্য ডা: মোহাম্মদ জুন্নুন চৌধুরী, যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ডা: মুজিবুর রহমান মজুমদার, যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি’র সিনিয়র সহ-সভাপতি গিয়াস আহমেদ, যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান জিল্লু, বিএনপি নেতা ডা: গুলজার আহমেদ, মানবাধিকার কর্মী বিউটি আকন্দ, মসজিদ বায়তুশ শরফের ইমাম জাকারিয়া মাহমুদ, হিলসাইড ইসলামিক সেন্টারের প্রেসিডেন্ট আবদুল আজিজ ভূঁইয়া, দারুল কোরআন ওয়া সুন্নাহ’র ইমাম মুফতি রুহুল আমিন প্রমুখ। সমাবেশে বাংলাদেশ ও মায়ানমারের উপর লিখিত সুপারিশ পাঠ করেন নতুন প্রজন্মের শারমিন ও ইশরাত রুমা।  



আমেরিকার ঐতিহাসিক টাইমস স্কয়ারে বেলা ১২ টা থেকে ৩ টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে আমেরিকান মুসলমানরা অংশ নেন। বিক্ষোভে অংশ নেয়ার জন্য সকাল থেকে নিউ ইয়র্কের বিভিন্ন স্থান থেকে বাস, সাবওয়ে ও প্রাইভেট গাড়ীতে নারী, পুরুষ ও তরুণ তরুণীরা টাইম স্কয়ারে জমায়েত হয়। সবার হাতে ছিলো বিভিন্ন ধরণের শ্লোগান লেখা প্লেকার্ড। এগুলোর মধ্যে উল্লেখ্য হলো- সেইভ বাংলাদেশ, গণহত্যা বন্ধ কর, নারী নির্যাতন বন্ধ কর, দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী, মাওলানা নিজামী, গোলাম আজম, আলী আহসান মুজাহিদ ও মীর কাসেম আলীকে মুক্তি দাও দিতে হবে। এছাড়াও সাংবাদিক মাহমুদুর রহমানের মুক্তি দাবী করে শ্লোগান ও প্লেকার্ড প্রদর্শন করা হয়। বিক্ষোভের ফাঁকে ফাঁকে জামায়াত নেতাদের মুক্তি এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবী করে শ্লোগান দেয়া হয়। 
ব্যস্তততম নগরীতে এতো বড় বিক্ষোভ দেখে আমেরিকানরা থমকে দাড়িয়ে ছিলো। অনেকেই বিক্ষোভের কারণ জিজ্ঞাসা করতে থাকে। বিক্ষোভের সংবাদ গুরুত্ব দিয়ে আমেরিকার বেশ কয়েকটি মিডিয়াতে স্থান পায়। আয়োজকরা এ বিক্ষোভকে বাংলাদেশের ইস্যূতে আমেরিকায় সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ বলে দাবী করেছেন।  


http://coalitionbdus.blogspot.com/2013/04/blog-post_202.html
ছবি নিউজে যে সব ছবি বাদ পড়েছে: 













                     


সর্ব প্রথম নিউজ http://coalitionbdus.blogspot.com/2013/04/blog-post_1226.html













Saturday, April 13, 2013

বাংলাদেশে শান্তি ও ন্যায় বিচার দাবীতে নিউ ইয়র্কের টাইম স্কয়ারে ছবিতে বিক্ষোভ


বাংলাদেশে শান্তি ও ন্যায় বিচার
 দাবীতে নিউ ইয়র্কের টাইম 
স্কয়ারে ছবিতে বিক্ষোভ




                   বাংলাদেশে শান্তি ও ন্যায় বিচার দাবীতে নিউ ইয়র্কের টাইম স্কয়ারে আমেরিকার বিভিন্ন 
                   মুসলিম সংগঠনের আয়োজিত বিক্ষোভে উপস্থিত জনতার খন্ড খন্ড অংশ।






























বাংলাদেশে শান্তি ও ন্যায় বিচার দাবীতে নিউ ইয়র্কের টাইম স্কয়ারে 
আমেরিকার বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দিচ্ছেন